আর কোনোদিন হইনি এমন মর্মাহত                 অনির্ণীত নারী                 তুলনামূলক হাত                 কাদাখোঁচা জলচর পাখি                 তোমাকে ছাড়া                 উত্তরাধুনিক বৃষ্টিপাত                 অপেক্ষার প্রহর অসহনীয়                 নিহারিকার নিরব দর্শন                 মশার জ্বালায়                 ঈদের কাব্য                 অনুভূতি                 নুপুরধ্বনি                 বিরহের মেঘাবৃত জীর্ণপ্রেম                  ব্যাথার স্বরলিপি                  তখন আমি কবিতা লিখতাম না                  বিষণ্ণতা খেয়ে যায় আনন্দ গুলো                 আষাঢ় শুভেচ্ছা                 ঈদের খুশি                 আবর্ত                 আমি                 উৎসবের ভ্রাতৃত্ব                

Sokaler Alo
June 18, 2018
Login
Username
Password
  সদস্য না হলে... Registration করুন

আর কোনোদিন হইনি এমন মর্মাহত
মহাদেব সাহা :

এর আগে আর কোনোদিন আমি 
হইনি এমন মর্মাহত
যেদিন তোমার চোখে প্রথম দেখেছি আমি জল, 
অকস্মাৎ মনে হলো নিভে গেলো সব পৃথিবীর আলো 
গোলাপবাগান সব হয়ে গেলো রুক্ষ কাঁটাবন। 
সত্যি এর আগে আর কোনোদিন আমি 
মর্মাহত হইনি এমন
যেদিন প্রথম পথে দেখলাম অনাথ কিশোর এক 
ক্ষুধায় কাতর কেঁদে মরে, 
তখনই আমার মনে হলো পৃথিবীতে কোথাও 
তেমন আর সুখ কিছু নেই
ফুলের দোকানগুলি হয়ে গেছে অস্ত্রের গুদাম।

আমি আর কোনোদিন মর্মাহত হইনি এমন
যেদিন প্রথম দেখি
ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় রক্ত লেগে আছে, 
যেদিন প্রথম সবুজ বৃক্ষের দিকে চেয়ে দেখলাম 
সেখানে লুকিয়ে আছে বিষধর সাপ, নদীর গভীরে
চোখ ফেলে দেখি এই জলে দূষণের বিষ, হাঙর-কুমির
তখনই দুহাতে ঢেকে মুখ বুঝলাম কতোখানি দুঃখী 
এই কাছের পৃথিবী। 
যেদিন প্রথম আমি আকাশের দিকে চেয়ে দেখলাম 
মেঘে বজ্র, ক্রূর ঘূর্ণিঝড় 
অরণ্যে ভীষণ সব পশু, লোকালয়ে খুনী আততায়ী 
তখনই আমার মনে হলো পৃথিবীর আলো অস্তমিত। 
এর আগে আমি আর কোনোদিন মর্মাহত হইনি এমন
যেদিন প্রথম শুনি প্রেমিক অক্লেশে বসিয়েছে ছুরি প্রেমিকার বুকে 
তখন বুঝেছি পৃথিবীতে দুঃখ ছাড়া চাষবাস হবে না কিছুই। 
এর আগে কোনোদিন এমন হইনি মর্মাহত
যেদিন বৃক্ষের কাছে গিয়ে দেখলাম রক্ত ঝরে বৃক্ষের শরীরে 
নদীর নিকটে গিয়ে দেখি নেই তার বুকে এতোটুকু তৃষ্ণারও জল 
তখনই বুঝেছি কতোটা নির্দয় হতে পারে এই ভালোবাসার পৃথিবী। 
সত্যি এর আগে আর কোনোদিন আমি হইনি এমন মর্মাহত
যেদিন দেখেও তুমি চোখ তুলে ফিরে তাকালে না।

...পুরোটা

অনির্ণীত নারী
হেলাল হাফিজ :

নারী কি নদীর মতো
নারী কি পুতুল,
নারী কি নীড়ের নাম
টবে ভুল ফুল।

নারী কি বৃক্ষ কোনো
না কোমল শিলা,
নারী কি চৈত্রের চিতা
নিমীলিত নীলা।

...পুরোটা

তুলনামূলক হাত
নির্মলেন্দু গুণ :

তুমি যেখানেই স্পর্শ রাখো সেখানেই আমার শরীর৷
তোমার চুলের ধোয়া জল তুমি যেখানেই
খোঁপা ভেঙ্গে বিলাও মাটিকে;
আমি এসে পাতি হাত, জলভারে নতদেহ আর
চোখের সামগ্রী নিয়ে ফিরি ঘরে, অথবা ফিরি না ঘরে,
তোমার চতুর্দিকে শূন্যতাকে ভরে থেকে যাই৷
তুমি যেখানেই হাত রাখো, যেখানেই কান থেকে
খুলে রাখো দুল, কন্ঠ থেকে খুলে রাখো হার,
সেখানেই শরীর আমার হয়ে ওঠে রক্তজবা ফুল৷
তুমি যেখানেই ঠোঁট রাখো সেখানেই আমার চুম্বন
তোমার শরীর থেকে প্রবল অযত্নে ঝরে যায়৷
আমি পোকা হয়ে পিচুটির মতো
তোমার ঐ চোখের ছায়ায় প্রতিদিন খেলা করে যাই,
ভালোবেসে নিজেকে কাঁদাই৷
তুমি শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিলে
আমি রথ রেখে পথে এসে তোমারই দ্বৈরথে বসে থাকি
তোমার আশায়৷ তুমি যেখানেই হাত রাখো
আমার উদগ্রীব চিত্র থাকে সেখানেই৷ আমি যেখানেই
হাত পাতি সেখানেই অসীম শূন্যতা, তুমি নেই৷

...পুরোটা

কাদাখোঁচা জলচর পাখি
মুহম্মদ নূরুল হুদা :

বাদমি রঙের পাখি, ওড়ে নিজ ছকে,

ছিট-ছোপ, দাগ, উল্কি ডানার পালকে;

হলুদ-বাদমি ঠোঁট, পা-জোড়া হলুদ

গাঢ় জলপাই রঙে শরীরটা বুঁদ;

কাদাখোঁচা জলচর পাখি,

ঘাসের ভেতরে বাসা, ক্ষিপ্র দুই আঁখি।

ঝাঁকে ঝাঁকে যায় উড়ে যায়;

অকস্মাৎ থেমে যায়, যদি

ফুসন্ত জলের বাধা পায় অবেলায়।

...পুরোটা

তোমাকে ছাড়া
অসীম সাহা :

তুমি যখন আমার কাছে ছিলে
তখন গাছের কাছে গেলে আমার ভীষণ আনন্দ বোধ হতো
লতাপাতার উৎসাহ দেখে আমি সারাদিন তার কাছে ঘুরে বেড়াতাম
কোনো কোনো দেন পাখিদের
বাষভূমিতে আমার অনেক উপাখ্যান শোনা হতো
তুমি যখন আমার কাছে ছিলে
তখন প্রত্যহ সূর্যোদয় দেখতে যেতাম তোমাদের বাড়ির পুরনো ছাদে
তোমার সেই যে দজ্জাল ভাই সারারাত তাস খেলে এসে
পড়ে পড়ে তখনো ঘুমাতো,
তুমি যখন আমার কাছে ছিলে
তখন আমার রোজ ভোরবেলা ঘুম ভাঙতো, যেতাম
প্রকৃতির কাছে মানবিক অনুভূতি নিয়ে
মানুষের দুঃখ দেখে আমার তখন ভীষণ কান্না পেতো
এখন আমার আর সেই অনুভব ক্ষমতা নেই
মানুষের নিষ্ঠুরতা ও পাপ দেখেও আমি দিব্যি চায়ের দোকানে
বসে হাসতে হাসতে চা খাই
সেলূনে চুল কাটার সময় পাশেই অবৈধ কতো কী ঘটে যায়
তুমি কাছে না থাকলে আমি দিন দিন অমানুষ হয়ে উঠি
আশেপাশে সবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি
মানুষ ও প্রকৃতির দিকে চেয়ে আমার হিংসা বোধ হয়
তুমি না থাকলে মেয়েদের রূপ কিংবা ফাহমিদা খাতুনের
রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুই আমাকে আকর্ষণ করে না
শিশুদের প্রতি মমত্ববোধ জাগে না আমার
একে একে সকাল দুপুর সারাদিন নষ্ট হয়
কোনোকিছুই করতে পারিনে আমি
তুমি না থাকলে বড়ো দুঃসময় যায়, সর্বত্র বন্ধুবিহীনভাবে
বাস করি
এই ঢাকা শহর ভীষণ রুক্ষ মনে হয়
কাউকি ডাকলে সাড়া দেয় না, সবাই আমার বিরুদ্ধাচরণ করে
তুমি না থাকলে এই বাড়িঘর শহরের লোকজন
সম্পূর্ণ আমার অপরিচিত মনে হয়
নিজেকেই নিজের অচেনা লাগে
মনে হয় দীর্ঘ দিন থেকে আমি যেন কোনো অজ্ঞাত অসুখে ভুগছি
তুমি না থাকলে বাস্তবিক আমি বড়ো কষ্টে পড়ি
বড়োই কষ্ট হয়।

...পুরোটা

উত্তরাধুনিক বৃষ্টিপাত
আবিদ আনোয়ার :

পরাবাস্তব বৃষ্টিতে ভেজে বগলের বর্ষাতি-- 
শুকনো আষাঢ়, মিছে গর্জায় আকাশের কালো হাতি;
কখনো ধূসর নীলিমায় শু’য়ে গর্ভিনী কোনো মোষ
হতাশার মতো প্রসব করছে সাদা-সাদা খরগোশ!

এ-আষাঢ় যাবে সাদাকালো আর নীলের কোলাজ দেখে?
বর্ষাসংখ্যা সাময়িকী জুড়ে মেঘের পদ্য লে’খে?
ঈশানের দিকে চেয়ে দেখি যেই জমছে সম্ভাবনা
‘বৃষ্টি হবে না’ ঘোষণায় বলে ঢাকা বেতারের খনা।

অবচেতনের কোথায় তবুও কদমের ঘ্রাণ পাই:
অলীক জলের শিহরণে কাঁপে করিডোরে বনসাই-- 
স্মৃতির ভেতরে পাঠশালা ভেজে, থকথকে বইখাতা;
আমি আর সাজু--মাথার উপরে যৌথ কলার পাতা।

ভেজা কিশোরীর শরীরের ঘ্রাণে সম্বিতে ফিরে দেখি
চৈত্রের মতো গদ্যরমণী চোখ ঠারে তার মেকি।
বৃথা শৃঙ্গারে শরীর কাঁপিয়ে শুয়ে পড়ি নিজ খাটে,
কামনার জলে “বঁধুয়া ভিজিছে দেখিয়া পরান ফাটে...”

করাতকলের শব্দেরা বোনে বর্ষাধুমল রাত-- 
আগামী শাওন বৃথা যাবে না তো, হবে কি বৃষ্টিপাত?

...পুরোটা

অপেক্ষার প্রহর অসহনীয়
নাজিয়া হোসেন :

নীলাঞ্জন,আমার দুটো ডানা থাকলে ঠিক দেখে আসতাম
রোদ্রুর ছুঁইয়ে থাকে যেমন তোমার জানালায়
তেমনি তোমার পিঠের উপর হাত রেখে বলে আসতাম,
নীলাঞ্জন, আমি বড় ভালোবাসি তোমাকে,
আমাকে ছূঁড়ে দিও না আটলান্টিকের
কঠিন বরফের দেশে !
আমাকে ফিরিয়ে দাও, আমার কোমলতা
আমার উন্মুখতা,
আমার স্বপ্নময় দিনগুলি ,
আমি শুধুই তোমার কঠিন শেকলের আবর্তে বন্দী হয়ে দিন দিনান্তর পার করে দিতে চাই
আমাকে ডেকে নাও, নীলাঞ্জন !
ডেকে নাও তোমার শিশুসুলভ সারল্যতায়
ডেকে নাও, অফুরন্ত আবেগী স্বত্তায়,
নীলাঞ্জন, আমার অপেক্ষার প্রহর
অসহনীয় হতে হতে
যদি সীমানায় পৌঁছে যায়
অচীন পারাবারে চলে যাবো
তবু তোমার জন্য অপেক্ষায় করে যাবো 
যদিও পেছনে অগাধ জলরাশী অথবা হীম শীতল বরফ থাকে ।

...পুরোটা

নিহারিকার নিরব দর্শন
নাসিমা খান :

চাঁদ জ্যোৎস্নায় একেবারে হাডুডাবু খাচ্ছিলো বিন্দু বাবু । সঙ্গে চমক মার্কা শাড়ী পরণে নিতুর । শরীর দিয়ে এক ধরণের বিদ্যুৎ ছটা জ্যোতি আলোকিত করে রেখেছে বিন্দু বাবুকে । জ্যোৎস্নার যত টূকু না নিতুকে গিলেছে তার বেশি গিলেছে বিন্দু বাবুর দুচোখ । ছমক ঠমকে চোখের বক্র চাহণিতে খতম হয়ে যাচ্ছিলো বিন্দুর রসিক দিল ।আকুপাকু করছিলো নিতুর হাতটি ধরার জন্য । কড়া নিষেধ করে দিয়েছে নিতু,- খবরদার বাবু, সীমা অতিক্রম করো না, আমি অন্যের বউ !  
বিন্দু বাবুর মনের ভিতর তখন আগ্নেয়গিরি  অগ্নুৎপাতের অপেক্ষা মাত্র । এই রমনীর দোলায়িত দেহ পল্লব তার হৃদয়ের তারে সুরের লহরী বাজিয়ে ফিরছে আকাশের সীমানা পেরিয়ে মাটির অতল পর্যন্ত । বজ্রের নিনাদ আর কতো জোরে ঘোষিত  হতে পারে, তার হৃদয়ের ঘোষণা তার থেকে আরো জোরে ঘোষিত হচ্ছে । আজ তোমাকে ছাড়বো না, যতই ছলাচাতুরী করো, ছলাকলায় ভুলার মতো মন আর আজ বিন্দু বাবুর নেই । ছিড়ে গেছে শরীরের সমস্ত তার । এখন ফিনকি দিয়ে কেবল অস্থির বাসনা হুল্লোড় তুলেছে সাগরের উন্মত্ততার মত ।  
জোর করে টেনে নিলো নিজের কাছে,- পালাতে পারবে না আজ । এতো রাতে ঘুম না হওয়ার অজুহাতে ছাদে উঠে আসার অর্থ শুধু পায়চারী আর চাঁদ দর্শন নয়, তুমি এই বিন্দুকেও চেয়েছিলে ।
নিতু জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,- খোলা আকাশ সাক্ষী আমি দেখতে চেয়েছি, গিলতে চেয়েছি চাঁদের রূপালী রস, কিন্তু চাঁদকে পেতে যাবার মতো বুদ্ধিহীন আমাকে ভেবো না, আজ রাতে চাঁদ দর্শন মাথায় তুলে রাখলাম । আমার বড্ড ঘুম পেয়েছে চললাম ।
ঝরা আর শুকনো পল্লবের মতো হতাশা বিন্দু বাবুকে ঘিরে ধরলো । মর্মাহত হয়ে ছাদের উপর রাখা চেয়ারে বসে পড়লো । সে এখন একা । রমনীদের চিনতে যাবার বৃথা চেষ্টা সে করে না। নিতু কত না ঠারে ঠোরে বুঝিয়েছে তাকে পেলে ধন্য হতো তার জীবন । এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াতে পারলে মনের জানলা গলিয়ে ফুর ফুরে গোলাপের শোভা আর সুবাস বেরুতে পারবে । দু একবার গায়ে গায়ে ইচ্ছে করে ধাক্কাও লাগিয়েছে । সাহস না দিলে কী সে আজ ওভাবে নিজেকে সমার্পণ করতে পারতো । লজ্জাও তাকে পেয়ে বসলো । ছিঃ ছিঃ কাল সে কীভাবে মুখ দর্শন করাবে । নিতু যদি এক দলা থুথু মেরে দেয় তাতেও আশ্চার্য হবার কিছু  থাকবে না । দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকলো সে। নিহারিকা বেঘোরে ঘুমুচ্ছে । বিয়ের রাত থেকেই বুঝেছে নিহারিকা তার নয় । সারাক্ষণ নিজের জগতেই হাবুডাবু খাচ্ছে । সাত প্রশ্নে এক জবাব দেয় । নিহারিকা , নিহারিকা বলে বত্রিশবার ডাকলে সামনে এসে বলবে,- ডাকছিলে কেনো বলো ?  
বিন্দু কাছে ডাকলে অবাক হয়ে প্রশ্ন করবে, কেনো ? শুধু শুধু তোমার পাশে বসে থাকার মানে কী ? তোমার প্রয়োজন হলে বলো আসবো ।
মুখ ফুটে কখনও নিহারিকা বলেনি , ভালোবাসি । অথচ স্বামী স্ত্রীর মাঝে এই একটি কথার প্রয়োজনীয়তা চাঁদ সূর্যের মতো কঠিণ সত্য । নিহারিকা এসব বোঝে না, নাকী বুঝেও অমন নিরশ বোধে বিভোর থাকে  বিন্দুর জ্বানা নেই ।
চা, হবে এক কাপ ?
নিহারিকা হয়তো এক ঘন্টা পর এক কাপ চা নিয়ে সামনে দাঁড়াবে । ভাবখানা এই ; খেলে খাও ,না খেলে গোল্লায় যাও ।
বিন্দু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলবে,- যাও নিহারিকা এখন তৃষ্ণা নেই ।
নিহারিকা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে যাবে রান্না ঘরে । বোধ নেই , নাকী বোধহীনতার অভিনয় করে বিন্দু বাবুর জানে না । সে যে পর স্ত্রীকে জোর করে জড়িয়ে ধরে এসেছে নিতু জানেও না, ঘুমের অতলে পড়ে আছে আর জানলেও  খুব বেশি প্রতিক্রিয়া হবে কীনা বিন্দুর সন্দেহ আছে । হায়রে জীবন তার ! সারা জীবন কল্পনায় দেখেছে উড়ন্ত এক উর্বশী, সারাক্ষণ দুরান্তপনায় ভরে রাখবে তাকে । তার সাথে লুডু খেলবে, গোল্লা ছুট খেলবে। চাঁদনী রাতে ছাছনার বিলে দৌড় প্রতিযোগিতা দেবে , কিন্তু এই নিরশ দেবী, মানুষ না মাটির মূর্তি বিন্দু বুঝতে পারে না । বিন্দু ভেবেছিলো সকাল হলেই নিতুর হাসবেন্ড চলে আসবে শুনতে কিন্তু কিছুই হলো না । সকালে উঠে চুল ঝাঁড়ছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিতু । মুখে কোনো ভাবান্তর নেই । নারীতে যে কত রূপ বিন্দু জানে না । সে উঠোনে নেমে একটি বেলী ফুল তুলে ছুড়ে মারলো নিতুর গায়ে । নিতু উদাসিনতায় একবার দেখলো ফুলটি তার পায়ের কাছে দলা পাকিয়ে পড়লো । হয়তো একটি পাঁপড়ি ঝরেও পড়লো । দোতলার বারান্দায় কাপড় নাড়তে এসে এই দৃশ্য নিহারিকাও দেখলো । বিন্দু সেদিকে একবার তাকালো তারপর হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো । রনবী বললো,- আজ স্যারের কলেজ নেই ? বিন্দু তখন নিতুকে ভাবছিলো। চুল ঝাড়ার সময় নিতুর শরিরের লতার মতো দুলুনী উপভোগ করছিল ।রমনীর সেদিকে বিন্দু মাত্র আগ্রহ ছিলো না । অথচ আশ্চর্য এই রমনী রাতে চাঁদের নির্যাস গিলতে ছাদে ওঠে । নিরবে কারো বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হলেও তা থাকে মৃত চাঁদের মতো ফ্যাকাসে । 
রনবী চা বানাতে বানাতে আকষ্মিক দেখলো,- নিহারিকা একটি তাতের শাড়ি পরণে, পিঠের উপর বড় একটি বেণী সাপের মতো নাচিয়ে বড় একটি সুটকেস হাতে রিক্সা ডাকছে । অবাক হয়ে বললো,- এতো সকালে ভাবী বুঝি বাবার বাড়ী দর্শনে যায় ?
বিন্দু বাবু অবাক হয়ে দেখলো। তারপর কান্ডজ্ঞান শূন্যের মতো চিৎকার চিৎকার করতে করতে ছুটলো , নিহারিকা, নিহারিকা কোথায় যাচ্ছো ?
নিহারিকা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসা বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো,- ফুল যারা দুপায়ে দলে যায়, তাদের পায়ের নিকট পুজোর ফুল গড়াগড়ি খায়, রাত্রে চাঁদের নির্জাসের লোভে যে মানুষ ঘুমন্ত স্ত্রীকে দরজা খোলা রেখে ছুটে যেতে পারে, তার বিপদের কথা চিন্তাও করে না, তার কাছে থাকবার দুঃসাহস আমার নেই ।
বিন্দু বাবু এতো দিনে যে নারীটিকে খুঁজে পেলো, সেই নাকী তারে ছেড়ে চলে যাচ্ছে , হাতটি জড়িয়ে ধরে বললো,- যাকে অনুভূতি  শূন্য ভেবে মরিচিকার পিছনে ছুটেছিলাম, আজ তাকে চিনতে পেরেছি, আমি তাকে যেতে দিতে পারি না, নিহারিকা ।
নিহারিকা সজোরে হাত ছাড়িয়ে রিক্সায় উঠে বসতে বসতে বললো, সিনক্রিয়েট করে, পাড়ার লোককে জাগিয়ে তুলো না । আমি এই ধরণের নপুংসক স্বামীর কাছে আর কখনও ফিরে আসবো না । চললাম ।
বিন্দু বাবু নিজেকে আর বেহায়া করার দূঃসাহস না দেখিয়ে , স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ।।

...পুরোটা

মশার জ্বালায়
স্বপন শর্মা :

মারছ মশা দিনে-রাতে
বাড়ছে মশা একই সাথে
লাভটা হলো কী?
তারচে বরং আসুন সবে
বিকল্প পথ দেখি!

বলছি না তো কয়েল জ্বালান
কিংবা সেথা কামান চালান
আছে কি তার দরকার!
নালা-ডোবা জঙ্গলা ঘাসে
মশা যেথায় দিব্যি -বাঁচে
সে সব করুন পরিস্কার।

মশা তখন নিধন হবে
সুস্থ সবল থাকবে সবে
সমাজ এবং সংসার,
তুমি আমি আমরা সকল
থাকব যে চমৎকার।

...পুরোটা

ঈদের কাব্য
এমদাদ শুভ্র :

ভাবনাতে কেউ অ-নেক উঁচু 
অনেকে এখনো ইতর 
অথচ পালন করছি ঈদুল ফিতর 
.
কতো সাধনা-সংযম সিয়ামের 
অথচ মনেতে জিদ
ভাবনাতে পড়ি কেমন হচ্ছে ঈদ 
.
চাঁদরাতে দেখা বাঁকাচাঁদআহা! 
তারও বেশি বাঁকা মন 
হচ্ছে কেমন এবারের ঈদ পালন
.
উঁচু-ইতরের ভেদাভেদ রেখে 
পুষে রাখা জিদ গোপনে ঢেকে 
অন্তরালে নিজেই কাটি সিঁধ
ঈদটা এবার কেমন হচ্ছেঈদ
.
ঈদ মানে খুশি গরিব ও ধনী 
জিদ ভুলে যাওয়া হোক
মহীয়ান এ প্রেম হৃদয়ের খনি 
ধ্বনি- ঈদ মোবারক

...পুরোটা

অনুভূতি
অপরাজিতা অর্পিতা :

আঙিনা জুড়ে কেবলি শূন্যতা,
অন্তরাত্মা পড়ে থাকে ফাঁকায়,
সারি সারি টেবিল চেয়ারে লেগে আছে অস্পষ্ট হাতের ছাপ,
বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায় চেনা কণ্ঠস্বর; বড্ড ক্ষীণ!
পরিচিত মুখ গুলো ভীষণ ঝাপসা মনে হয়।
 
একটা অনুভূতি,
একটা বন্ধন,
আর এক গুচ্ছ মায়া!
যা আবদ্ধ করেছে অনেক গুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণ।
মন সে তো মনেই থাকে,
দেহে থাকে প্রাণ আর
সাথে থাকে একরাশ ভালবাসা,
অদৃশ্য বিনি সূতোয় গাঁথা।
 
প্রিয় ক্ষণ,
একান্ত কাটানো সময়,
রঙের সাথে মিলানো রঙ,
চোখে চোখে দেখা অনন্ত মহাকাল;
অনুভূতির প্রত্যয়টা গড়ে উঠেছিলো সেদিনই,
যেদিন আধখাওয়া খাবারে জন্মেছিলো অংশীদারিত্বের অধিকার।
অনুভবের অনুক্ষণে জন্ম নেওয়া অধিকার কোথাও প্রশ্রয় পাক বা না পাক,
ঠাঁই করে নেয় অনুভূতির আত্মায়।
 
সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকা অনুভূতি হাসায়, কাঁদায়, ভাবায়।
পাশ ফিরলেও তবু ছোঁয়া যায়না,
জড়ানো যায়না আবেগে।
বিশ্বাস থেকেই বিশ্বাস জাগে,
অনুভূতির অমূল্য এ বন্ধন ভীষণ অটল।
...পুরোটা

নুপুরধ্বনি
মোঃ জাহিদুল ইসলাম :

অন্ধকার রাত। চারপাশ অন্ধকারের কালো কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার।

নয়জি বয়েস। মেসের নাম। মেসটা ছিল  লোকালয় ছেড়ে প্রায় উত্তর পশ্চিম সীমান্তে। মেস থেকে কয়েক কদম হাটলেই চন্ডি পাড়া শুরু হয়। কালীমন্দিরের সামনে দিয়ে মেসের রাস্তা চলে গেছে। কালীমন্দিরের দিকে আমি অন্তঃনয়ন দিয়ে যতই না তাঁকাতে চাই তবুও দৃষ্টি চলে যায়। যৌবন সত্যিই লাজ-লজ্জাহীন। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। তবে, ভুলেও কখনো আঙ্গুল তুলে প্রতিমার দিকে তাকাই নাই। হিন্দুধর্মের মাঝে নাকি একটা ট্যাবু আছে, যারা আঙুল তুলে প্রতিমাকে দিকে দেখায় তাদের নাকি মাঝরাত্রিতে কালীদেবী দেখা দেয়। কালীদেবীর দেখা পাওয়া মানে তার নিশ্চিৎ মৃত্যু !

কালীমন্দির ফেলে কয়েক কদম এগুলে উত্তর পাশে নারায়ণ গুচ্চুর ফাঁকা ভিটে। একটা বনের বেড়া আর টিনের চালার ঘর।সেখানে তেমন কেউ থাকত না।মাঝে মাঝে গুচ্চুর ছেলে পাঁচন থাকতেন । বছর পাঁচেক আগে তাকে তিনিও নাকি ঘরের ভিতর মারা যান। পাঁচন বাবুর মৃত লাশে অনেক আঁচড় পাওয়া যায়। দক্ষিন দিকে ঝোঁপ-ঝাঁড় ঘেঁষে একটা মেটে রাস্তা চলে গেছে সোজা পুষ্কুনির পাশ দিয়ে।

চাঁনপুকুর। পুকুরের নাম চাঁনপুকুর হলেও এ যাবৎকালে কাউকে সেখানে স্নান করতে দেখা যায়নি। ওই রাস্তার সাথেই ছিল
গফুর মুন্সির আখের (ক্ষেত)বাগান, আর বাগানের  ধার ঘেঁষেই চাঁনপুকুর। করচা আর আখের বাগানের অর্ধেকই পুকুরে নেমে এসেছে। লোকমুখে শোনা যায়,ওই পুকুরের পানি কোনদিন শুকাতো না। সুন্দর ঘাঁট করা পুকুর । সবুজাভ কালো রঙের পানি। পুকুরের পানিতে একটু পর-পরই খাবি খাওয়ার শব্দ শোনা যায়। অনেক মাছ হবে বোধহয়। পরিত্যক্ত পুকুর বলে কথা !

মেসে আমরা বড়-ছোট মিলিয়ে প্রায় দশ-বারো জন ছিলাম।সবাই হোমড়া-চোমড়া স্বাস্থ্যের অধিকারী। কেবল আমিই বোধহয় একটু জোরে হাওয়া দিলে হেলে পড়তাম। আমার অবশ্য এতে কোন আক্ষেপ ছিল না। সারাদিন চুটিয়ে আড্ডা আর রাতে মনোযোগ দিয়ে পড়া। বেশ কেটে যাচ্ছিলো।
বাড়িটায় আমরাই ছিলাম সর্বেসর্বা। বাড়িওয়ালা বিশেষত এ বাড়িতে থাকতেননা। মাস শেষে এসে শুধু ভাড়াটা নিয়ে চলে যান। লেখাপড়া করার জন্য শহরে এসেছি কিন্তু থাকার জন্য যে এমন গ্রাম্য এলাকা পাওয়া যাবে ভেবেই অবাক লাগছে। ভাড়া স্বল্প। বাড়ির অবস্থাও বেশ ভালো ছিল। সব মিলিয়ে একটা সুপার প্যাকেজ!

আমার একটা আলাদা বদঅভ্যেস ছিল। দিনের চেয়ে রাত জেগে পড়ার প্রতি বেশি ঝোঁক । দেখা যেত কোন কোন দিন পড়তে পড়তে রাত তিনটে চারটে বেজে যেত। আমি যতক্ষন জেগে থাকতাম,ততক্ষন আর কেউ জেগে থাকত না। সবাই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকতো । রাসেল ভাই আর সম্ভু ভাই মাঝে মাঝে সিগারেট খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠতেন তবে সবদিন না হঠাৎ হঠাৎ !

রাত জাগার সুবাদে প্রায়দিনই আমি এক অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিষের দর্শন পেতাম। ঘরের চারকোনায় অদৃশ্য নুপুরের আওয়াজ। কেউ শুনতো কিনা জানিনা তবে আমি শুনতাম। অতি মোহনীয় তার রিনিঝিনি নুপুরের শব্দ। প্রায়সময়ই লেখাপড়ার চেয়ে শব্দটা শোনার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। কিন্তু, কখনো দুঃসাহস করে ঘর থেকে দুপা ফেলে দেখা হয়ে উঠতোনা অচেনা জিনিষটাইবা কি ?

শুক্রবারের রাত। আকাশ পুরো অন্ধকার। বাইরে প্রচন্ড গরম পড়েছে। ঘরের বাইরের জানালাটা ভেজিয়ে দেওয়া । ভিতরের দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে পড়ছি। সম্ভু ভাইয়ের কড়া নির্দেশ হাজারো গরম কিংবা শব্দ হলেও দরজা-জানালা খোলা যাবেনা। আমার ঘরটা ছিলো দক্ষিন পাশের সরু রাস্তাটার সাথে। যে রাস্তাটা পুষ্কুনির পাঁশ দিয়ে দূরের একটা লোকালয়ে চলে গেছে। আমার ঘরের একটা জানালাও সেদিকে ছিল। অত্যাধিক গরমে অসহ্য হয়ে, বাইরের হাওয়া ঘরে প্রবেশ করানোর জন্য কয়েকটা জানালা খুলে দিয়েছি। পরীক্ষার আগের রাত যেন খুব তাড়াতাড়িই গভীর হয়ে যায়। বন্ধুদের অনেকেই দশটা না বাজতে আজ শুয়ে পড়েছে। কিন্তু, প্রতিদিনের অভ্যেস বশত ঘুমাতে অনেক দেরি হয় বই পড়ছি।পড়তে পড়তে কেবলই তন্দ্রা মত এসেছি,ওমনি জানালায় মৃদু টোকার শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। একবার নয় দু..দুবার !

চোখের পাতা থেকে ঘুম শব্দটা উবে গেল। ছ্যাৎ করে চমকে উঠলাম। টেবিল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ০২.৩৯ বাজে। ভাবলাম,এত রাতে কে টোকা দিল! তারপর মনে হলো, হয়ত আশেপাশের কোন লোক
রাস্তা দিয়ে যেতেই হাতের টোকা লেগেছে।তাই তেমন গুরুত্ব দিলাম না।
আর রাত যেহেতু অনেক হয়েছে তাই দেরি না করে ঘুমাবো বলে লাইট অফ করে দিলাম। কিছুক্ষনের মধ্যে চোখ ভার করে ঘুম চলে এসেছে প্রায়, এমন সময় আবার
দুটো টোকা। এবারের টোকা গুলো আগের গুলোর চেয়ে জোড়ে হলো। বুকে হপারের মত শব্দ হচ্ছিলো। নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম। ধরফর করে বিছানা ছেঁড়ে উঠে  বসে পড়লাম।জোড়ে করে
বললাম, “কে? “
কোন সাড়া পেলাম না।

হাতের কাছের বেড সুইচ টা দিয়ে আলো জ্বালালাম। আলো জ্বালানোর সাথে সাথে জানালার পাশ থেকে কে যেন পুকুরের দিকে প্রথমে আস্তে পরে জোড়ে হেটে চলে গেলো। নিঝুম রাত্তিরে স্পষ্ট পায়ের শব্দ পেলাম”’ না কিন্তু সুর তোলা নুপুরের আওয়াজ বলে দিল সব। ভয়ে ভয়ে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিলাম। কিন্তু কই? কেউ নেই তো। ঘরের টিউবলাইটের সাদা আলো জানালার ফাঁক গলে রাস্তার উপর পড়েছে। সেখানে অন্ধকার কুয়াশা ছাড়া আর কিছু নেই।
কি আর করা,জানালা বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়লাম। মনে মনে নিজের বোকামির কথা ভেবে নিজেই লজ্জা পেলাম। সকালে উঠে কাউকেই কিছু বললাম না। শেষে সবাই এ নিয়ে হাসাহাসি করে! মনকে বুঝালাম,
দূর, ভূত টুত কিছু না। সব মনের বিভ্রম!

দ্বিতীয়দিন। সেদিনও পড়ালেখা শেষ করে সাড়ে দেড়টা নাগাদ বিছানায় শুলাম।মেসের অন্যরা অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার চোখে তখনো ঘুম আসেনি।
আমি পুরোপুরি সজাগ। হঠাৎ আবারো
জানালায় জোড়ে জোড়ে দুটো টোকা পড়লো। আকষ্মিক এ শব্দে আমার বুক ধরফর ধরফর করে উঠলো। স্পষ্ট জানালায় টোকা দেয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। বুকে একটু সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞাসা করলাম, “
কে? কে ওখানে? “
কেউ কোন কথা বলল না, শুধু একটা মেয়েলি হাসি শুনার শব্দ পাওয়া গেল।তারপর কেউ নুপুর পায়ে দৌড়ে গেলে যেমন শব্দ হয়,তেমন একটা শব্দ। গা ছম ছম করে উঠলো। ওটা কে হতে পারে ! 
জানালার ছোট্ট ফোঁকড় দিয়ে মাথা গলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। অদূরে একজন রমণী তার তানপুরার মত নিতম্বকে বাঁকিয়ে হেটে যাচ্ছে। কিছুটা সন্দেহ হল।কিন্তু বাইরে বেড়িয়ে দেখার মত সাহস হলোনা।

কৌতুহূলী মন মানছেনা। নূপুরধ্বনির শব্দটা আবার শোনা গেল। শব্দের উৎপত্তিটা মনে হল একদম শিয়রের পাশ থেকে আসছে। সব সন্দেহ ঝেড়ে ফেলে, ভেজানো দরজাটা আস্তে করে খুলে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখলাম। কেউ জেগে নেই। সবাই গভীর ঘুমে মত্ত।  টিনের চালার ওপর গাছের কালো কালো ডাল ঝুলে রয়েছে। কয়েকটা ডাল চালা থেকে নেমে উপুড় হয়ে মাটির দিকে তাঁকানো, সেখানে কয়েকটা কেঁচো তখন গর্ত খুঁড়তে ব্যস্ত। চোখের মতন পাতারা বাতাসে বারকতক পিটপিট সেরে একটানা ও দৃশ্য দেখায় নিমগ্ন খুব। লম্বা আর নিজের মধ্যে অনবরত প্যাঁচ খাওয়া প্রাণিগুলো অন্ধকারে প্রবেশ করার সময় তাদের অজান্তেই খোড়নের নমুনা ওপরে রেখে যায়। ঝুলে পড়া গাছটার পাশেই শিরা উপশিরার মতো রাতের পুরো আকাশ দখল করে নেয়া বড় গাছের বিরাট বিরাট ডালপালা। ছোট গাছটা মনে হচ্ছে ঘুমে ঝিমুচ্ছে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ছোট গাছটার সাথে ধাক্কা খেয়ে গাছটা একটু নড়ে উঠলো। তার মাথার উপরের ডালপালায় হঠাৎ নাড়া খাওয়ার
শব্দ। ঝটপট ঝটপট শব্দ করে বিশাল এক ঝাঁক বাদুড় নামলো। এত বাদুড়ের একসাথে নামার শব্দে একটু চমকে উঠলাম। পায়ের তলায় চাপা খায় কেঁচোর খুঁড়ে যাওয়া দানাদার গোল মাটি। উপরের দিকে মুখ তুলে
তাকালাম। আলোর ঝিটে-ফোঁটা বলে কিছু নেই। ঘরের চাল, চালের উপর ঝুঁকে থাকা গাছ, তার উপরে, তারও উপরে এবং তার তারও উপরে শত সহস্র লক্ষ লক্ষ বাদুড় দুলছে। তখন মাথার উপর পুরো আকাশটাই
ডানে বাঁয়ে দুলতে থাকে। মনে হচ্ছে যেন কয়েক লক্ষ চোখ আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে আর অন্ধকারের মধ্যে সবাই আমাকে দেখছে উল্টো করে। আতংকে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মাটি হাতড়ে একদলা মাটি নিলাম।  ঢিলের মত বানিয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে ও দিকে ছুঁড়ে দিলাম। কালো পাখায় তখন চারিধার এমনভাবে ছাওয়া যে সে জানে, যে কোন একদিকে ঢিল ছুঁড়লে অন্তত ঐ দিকের অন্ধকারটা একটু পাতলা হয়ে যাবে। ঢিলটা কোথায় পড়লো বোঝা গেল না
কিন্তু বাদুড়েরা নাড়া খেয়ে সরসর সরসর করে উড়তে লাগলো। একজোড়া দুই জোড়া বাদুড় নয়, একসঙ্গে আবার সেই শত সহস্র লক্ষ বাদুড় ঝটপট ঝটপট করতে লাগলো।
দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে তারা একদিকে যেতে লাগলো। বাঁদুড়গুলোর ছায়া থেকে মাটিতে চোখ নামিয়ে দেখলাম, অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি জনশূণ্য পথ ধরে হেঁটে চলছে। 

শাড়ি পরহিত। অন্ধকারের কারণে বলতে পারছিনা শাড়ির রঙটা কি ! নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ হচ্ছে। মেয়েটার পথ চলার মোহনীয় সৌন্দর্য আমাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করছে। চোখে ঘোর লেগে গেছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি এখন মেয়েটার কাছে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত। মেয়েটা যেদিকে হেঁটে চলেছে আমি হাওয়ায় ভেসে শুধু তাকে অনুসরন করছি। সৃষ্টির কি অপার সৌন্দর্য !

হাঁটছি না দৌড়াচ্ছি বুঝে উঠতে পারছিনা। অন্ধকারের কারণে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তবে মেয়েটার নূপুরধ্বনি  অন্ধকারের তীব্রতা  ভেদ করে আমাকে পথ চিনিয়ে নিচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ নূপুরগুঞ্জন থেমে যায়। আমারও ঘোর হঠাৎ করেই কেটে যায়। ভাবছি, এ আমি কোথায় এলাম !

আশপাশে পশুর গর্জনের মত গড়গড় শব্দ শোনা যাচ্ছে। অজানা ভয়ংকর আশঙ্কায় আমার মন কুহু ডেকে উঠলো। দুহাত হাঁতড়ে দেখলাম আখ আর করচা বাগানের ভিতরে এসে পৌঁছেছি। সামনে এক কদম এগিয়ে দেখলাম জলার পানির শব্দে ব্যাঙ ডাকছে। কোথাও অপেক্ষা করছে ভয়ানক সংকট তাই দিক-বেদ্বিক শূণ্য ভেবে দৌড়াতে লাগলাম আখ, করচার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে।
হৃদপিন্ডটাতে হপারের ন্যায় শব্দ হচ্ছে। প্রচন্ড শব্দে মনে হচ্ছে হৃদপিন্ডটা বোধহয় খাঁচা ছেড়ে এখনই বেরিয়ে আসবে।

আকাশে কোন চাঁদ নেই। কৃষ্ঞপক্ষ। অন্ধকারে আমার চোখের অবলাল সংবেদী এখন কাজ করছে। দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকায় আশে-পাশের অবস্থা কিছুটা দেখতে পাচ্ছি। আখবাগানের ফাঁক দিয়ে অন্ধকারের অল্প কালো আলো তির্যকভাবে মাটিতে পড়ছে কিন্তু মাটি তখন এত কালো যে সামান্য ঐ আলো শুষে খেয়ে নিচ্ছে মুহূর্তেই। তাই অন্ধকারের মধ্যে মাটি ও আকাশ পার্থক্য করার মতো তেমন কিছু ফুটে উঠলো না। একটা ব্যাঙ দূরে কঁকিয়ে ওঠে, কোন সাপের মুখে পড়ে সে ত্রাহি চিৎকার দিচ্ছে। একদল ঝিঁ ঝিঁ পোকাও ক্রমাগত ডেকে ডেকে থেমে যায়। যেই ঝিঁ ঝিঁর ডাক থামে বাগানটি হয়ে পড়ে আরও নীরব, দৌড়ানো বাদ দিয়ে হঠাৎ থমকে  দাঁড়াই । এই বাগানে কখনও আসা হয়নি, ডানে বাঁয়ে এদিক সেদিক চেয়ে কোন একটা পথ খুঁজতে থাকি। মাইলের পর মাইল অতিক্রম করার পর এই প্রথম নির্দিষ্ট কোন পথের আশায় কেটে ছিড়ে যাওয়া হাত লতাগুল্ম সরিয়ে এগিয়ে যাই। কুশুলের বাগানের যেখান দিয়ে আমি দৌড়ে যাই, ভেজা মাটিতে  সেখান দিয়েই তৈরি হয় পথ। চলতে চলতে একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ি। মনে হয়, কিছু দূরে একজন লোক কোন কিছু ঠেলতে ঠেলতে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। প্রথমবার ভাবি যে তাকে ডাক দিয়ে থামতে বলা প্রয়োজন, তারপর কিছু না বলে লোকটির দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকি।

অচেনা লোকটি প্রায় আট-নয় ফুট লম্বা, দুই হাত দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একটা পাথর টানা বিশাল ট্রলি। ট্রলি ঠেলবার সময় সাধারণত মানুষ সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। কিন্তু সে ঐ বিশাল ট্রলিটা নিয়ে চলছে কোনরকম না ঝুঁকেই। ট্রলিটার দিকে ভালভাবে তাকিয়ে দেখলাম ওতে রয়েছে অনেক ওজনের বেশ বড়মাপের অনেক পাথর। কিন্তু এত ওজনের পাথর লোকটি
এমনভাবে ঠেলছে যেন ওগুলো পাথর নয়, শিমুল গাছ থেকে সংগ্রহ করা সাদা সাদা তুলোর বল। অপেক্ষা করছিলাম লোকটি কিছু জিজ্ঞেস করবে, কেননা এই
রাতবিরেতে জঙ্গলের মাঝখানে হঠাৎ কোন মানুষের উদয় হওয়া নিশ্চয়ই কোন সাধারণ ব্যাপার নয়, কিন্তু পাথর ঠেলা লোকটি  কিছুই জিজ্ঞেস করে না। আনমনে নিজের কাজ করতে থাকে। আমার কৌতুহূল মন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেরি নিজ থেকেই সে কে, এই পাথর কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এসব প্রশ্ন করবো।  কিন্তু লোকটি এমনভাবে চলছে যে সে প্রশ্ন করলে উত্তর পাবে, এমন আশা হয় না। পাশাপাশি হাঁটার কারণে  লোকটির চেহারা দেখা যাচ্ছেনা। তবে
মাঝেমাঝে চেষ্টা করছি দুই পা এগিয়ে লোকটির মুখোমুখি তাকাতে-যাতে কাল দিনের আলোয় তার সম্বন্ধে কিছু জানার চেষ্টা করতে পারি। যতবারই চেষ্টা করে দুই পা এগোতে যাই, অচেনা লোকটি ততবারই ভারি পাথরের ট্রলিসহ সব সময় সমান্তরালেই রয়ে যায়। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা ধরে প্রথমবারের মতো দূরের
একটা লোকালয়ে এসে পড়ি। ট্রলি ঠেলা লোকটি সেই লোকালয়ের দিকে চলতে থাকে। লোকটার চলনভঙ্গি দেখে এবার শিওড়ে উঠলাম। একি!  লোকটা মাটিতে পা ফেলে হাঁটতে পাচ্ছেনা কেন  ?

অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, লোকটার গাঁয়ে এতক্ষণ যেটা পায়জামা-পাঞ্জাবি বলে ভাবছিলাম সেটা আসলে আস্ত কাফনের কাপড়। ধবধবে কালো। অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছিলোনা। তবে, শার্ট-প্যান্ট ও কাফনের কাপড়ের মাঝে পার্থক্য বুঝে উঠা যায়। তবে এত ভারী পাথর নিয়ে অচেনা লোকটা কি করছে, এইসব নিয়ে যখন ভাবতে থাকি তখন দেখতে পাই সেই লোকটি তার ট্রলি থেকে একটা সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো মাংসের স্তূপ তুলে তরতর করে উঠে যাচ্ছে একটা পোড়ো-বাড়ির ছাদে। নারায়ণ গুচ্চুর ভিটের পুরোনো ঘরে।আমার মনে হচ্ছে আমি সে সময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এবং সেই গভীর ঘুমের ভেতর অনুভব করছি এ যেন চেপে বসা দুঃস্বপ্ন। অচেনা লোকটা থেকে দুকদম পেছনে চলে যাই। কিন্তু, কাঁধের উপর হালকা গরম নিঃশ্বাস টের পাই। পেছনে মুরে কোন অতিপ্রাকৃত জিনিষ দেখার সাহস হয়না। নুপুরের ধ্বনিটা কাছেই কোথাও শোনা যায়। চোখের সামনে কোমড়ের অর্ধাংশবিহীন মানুষ দেখার দূর্ভাগ্য নিঃশ্চয় হয়নি। অতিপ্রাকৃত জিনিষ তখনো কোমড়টা তানপুরার সুরের মত করে একেঁবেকে দুলিয়ে চলেছে। পাঁয়ের নুপুরগুলোও সেই দুলুনিতে রিনিঝিনি শব্দে বেঁজে চলেছে। আমার মেরুদন্ড বেঁয়ে শীতল বাতাস নেমে গেল। কাঁধের পিছনে যা দেখলাম তা দেখে স্থির থাকা আর সম্ভব হলোনা। স্যাঁতসেঁতে কিছু আঁশটে তরল আমার কাঁধের উপর চ্যাঁটচ্যাঁট করছে। মুখমন্ডলটা একটু উপরের দিকেই ঘুরিয়ে দেখলাম বিকৃত চেহেরার একজন আমার দিকে তাঁকিয়ে ভয়ংকরভাবে হাঁসছে। 
বুকে টের পেলাম বাড়তি এক গাঢ় চাপ। দ্রুত গতিতে নিঃশ্বাস ওঠানামা করে, বুকের ঘাম গড়িয়ে নাভির কালো গর্তে জমা হয়। শরীরে অজানা এক অস্বস্তি, এপাশ থেকে ওপাশ করতে করতে উদ্বিগ্ন মন পালাবার জন্য তাড়া দিতে থাকে। এসবের পর লম্বা অচেনা লোকটি ধীরে ধীরে চলে যায় অন্যদিকে, নুপুরের শব্দ করা প্রাণীটা কোথাও যায়না। আমি আমার দেহে প্রবল এক শিহড়নের অনুভব করতে থাকি। উল্টো ঘুরে ভো-দৌড়। কিন্তু আলো না ফোটা পর্যন্ত দৌড়ে এতদূর এসে বাড়ি যেতে পারছি না, আসলে এখনও বুঝতেই পারছি না আদৌ আমি এখন কোথাই। তাই না থেমে পুনরায় দৌড়ানো শুরু করি। আকাশে অন্ধকার হালকা হয়ে আসছে, হয়তো ভোর আসন্ন, হয়তোবা এতক্ষণ আঁধারে থাকতে থাকতে অন্ধকার সয়ে নিয়েছে চোখ। কান পেতে শুনতে পাই বাতাসে ভেসে আসছে স্রোতের কুলুকুলু ধ্বনি। ভালোভাবে কান পেতে শোনার চেষ্টা করি, তিরতির করে কোন এক জায়গা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পানি। শব্দ লক্ষ্য করে ক্রমাগত দৌড়াতে থাকলে বুঝতে পারি কুলকুল ধ্বনি তীব্রতর হচ্ছে। পিছনে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। পায়ের নিচে মাটির বদলে এখন বালি, এখানে সেখানে ছোট ছোট নুড়ি। ছলছল স্রোতে চারপাশ মুখরিত, এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বুক জুড়িয়ে দেয়। সে তীর ধরে দৌড়তে দৌড়তে দেখতে পাই অদূরে অনেকগুলো মানুষ স্রোতের ধার ঘেঁষে কি যেন খোঁজাখুঁজি করছে। অচেনা মোহনীয় রূপের পেছনে ছুটে আমি এখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। শরীরকে তবুও টেনে টেনে, ঠেলে ঠেলে চলতে থাকি অবিরাম। চোখের আলো ক্রমশ ঝাঁপসা হয় কিন্তু চলার জন্য তখন চোখের প্রয়োজন নেই, অতীন্দ্রিয় কোন অনুভব চালিয়ে নিচ্ছে। এক জায়গায় এসে দেখলাম পথটি দ্বিখণ্ডিত।সেই দ্বিধাবিভক্ত রাস্তার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে পড়ি, দুটি রাস্তাই ক্রমশ উঁচু হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে। জ্ঞানশূণ্য হয়ে একসময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। অদূরের মানুষগুলো কাঁদামাটি মাখা শরীরে আমার দিকে দৌড়ে এগিয়ে আসছে। আখ ক্ষেতের সর্বশেষে চলে এসেছি। এখান থেকে নতুন লোকালয় শুরু! আখক্ষেতের শেষপ্রান্তে এসেই বাঁতাসের ভয়ানক শব্দটা নুপুরের রিনিঝিনি শব্দে রূপ নিয়েছে। তার সাথে আরো একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে, দূর আকাশের পরিষ্কার নির্মল বাতাসে ফজরের আযানের মিষ্টি শব্দ ও চাষাদের হৈ-হুল্লোড়!

 

...পুরোটা

বিরহের মেঘাবৃত জীর্ণপ্রেম
আল মামুন :

খন্ড খন্ড মেঘ গুলো জড়ো করে রেখেছি এই আষাঢ়ী দুচোখের জন্য,
শুভ্র এ জীবনে তোমারি মেঘমন্দ্র চূর্ণ করলো প্রেয়সী আমারি সহস্র বছর ধরে ফোটা প্রেমরাঞ্জী।
বিরহের মেঘাবৃত জ্বীর্নপ্রেম তোমারই স্মরণে আজি বেদনার পল্বল।
নিশি কালো রজনীর একাকীত্ব সময়, কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে এই রক্ত মাংসের প্রাণহীন দিব্যকান্তি দেহ।
তাই
হৃদয় সিঁথির লাল সিঁদুরে অসমাপ্ত প্রেমকাব্য, চোখের দু ফোঁটা অশ্রু মিশ্রিত কাজল করে
রেখে দিলাম আমি হীনা তোমার ডায়েরির শেষ পাতায়……

ভালো থেকো প্রিয় প্রেম বারীন্দ্রের স্নিগ্ধ বারি ধারায়_________?!

...পুরোটা

ব্যাথার স্বরলিপি
ফাহমিদা বারী :

বহু দূরে বাঁজে একাকিনী বাঁশী করূণ এক সুরে ঐ,
মনেতে ভিড়েছে কত কথা আজ,পায়না খুঁজে তো থই।
হারিয়ে ফেলেছি সোনালী সে দিন কত সব প্রিয় মুখ,
বুকের মাঝেতে আগলিয়ে রেখে বাড়িয়েছি শুধু দুখ।
শীতের নরম ওম ভরা ভোরে মনে পড়ে যায় মাকে,
ভাবিনি কখনো কাটাতে হবে দিন থাকতে ছেড়ে যে তাকে।
মায়ের মমতা হাতড়ে বেড়াই খুঁজে যদি পাই কভু,
কোন্‌ সে আদলে বানিয়েছ তাকে পাইনা কেন হে প্রভু?
বাবার শাসন, বুক ভরা স্নেহ্‌…কেমনে ভুলবো আমি!
রেখেছি জমিয়ে বুকের গহীনে সোনার চেয়ে তা দামী।
“বাবা” বলে ডেকে পুত্রের মাঝে অবাক নয়নে দেখি,
তেমনি সে মুখ, বুক ভরা স্নেহ, ভরে যায় জলে আঁখি।
মঞ্জুটা ছিল পাশের বাড়িতে খেলার সাথী সে মোর,
দুজনে মিলে কত যে খেলেছি কতই না তোড়জোড়।
বজলু চাচাকে পড়ে খুব মনে এনে দিত ঝালমুড়ি,
পড়াতে বসায়ে কান মলে দিত ডাকতো আমায় “বুড়ি”।
ছোট ভাই দুটি দূরদেশে গেল মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে,
ব্যাথাতুর মনে কাঁদছে হৃদয় শুধু আজ কুরে কুরে।
হারানোর মাঝেই খুঁজে ফিরি আজ নূতন মায়ার বাঁধন,
জেগে ওঠে চর নদীকে বিলিয়ে এমনি জগৎ নিয়ম।।

...পুরোটা

তখন আমি কবিতা লিখতাম না
নাহিদ জোয়েল :

তুমি আমার নিকট একসময়, একদিন
অনেকগুলো কবিতা চেয়েছিলে; সেদিন
তখন আমি কবিতা লিখতাম না।
আমি তো প্রফেশনাল কবি নয়,
তোমার আশ্বাসে শুরু আজ কবিতার কবি হয়।।

রাতের নির্জনতা যখন একরাশ চাঁদনী, এসেছিল
তোমাদের পূর্বকার মেহগনী বাগানে; তখন
আমি কবিতা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম,
কখন মিলব দুজনে।
রাত কেটে দিনের রবি যখন, এল
তোমার বাড়ীর পাশে; তখনও
তুমি এলে না; জানি না, তখন
তোমার কি ছিল মনে।।

আমার কষ্টের লিখা কবিতা হল না প্রকাশ।
আমার অধৈর্যজীবনে রয়ে গেল বৃষ্টি, হয়ে গেল আকাশ।।

...পুরোটা

বিষণ্ণতা খেয়ে যায় আনন্দ গুলো
আনিসুর রহমান জুয়েল :

জোনাকির আলো ছুঁয়ে যায় 
তৃষ্ণার্ত অনুভব 
বিষণ্ণতা খেয়ে যায় আনন্দ গুলো ।

খাঁ খাঁ খড়ার মতো জীবন
একটু ঝুম বৃষ্টি খুঁজে 
অস্থির দহনে ।

আবেগী হৃদয় ঘুমিয়ে আছে 
স্বপ্নে সুখ পেতে 
চুপিসারে ভাঙা পাঁজরের ভেতর ।

অবেলায় স্মৃতির পাতা গুলো 
খসে পড়ে 
বাতাসের ঝাপটায় ।

মনের নীল আবেগ গুলো 
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে 
ন্যাপথালিনের মতো উড়ে যায় মায়া ছড়িয়ে ।

...পুরোটা

আষাঢ় শুভেচ্ছা
ময়েজ মোহাম্মদ :

এক আষাঢ়ে রাত দুপুরে
তোর কথা যে মনপুকুরে।
আয় না সখি হাতে ধরি
দিকবিদিকে বেরিয়ে পড়ি।
বাঁধনহারা পাগলপারায়
ভিজবো জলে শ্রাবণধারায়।
বেণী বাঁধা কোকিল চুল
খোপায় দেবো কদম ফুল।
কপোল জুড়ে বৃষ্টিফোটা
উপহার দিস পরশ দুটা।
ভেজা শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে
লুকিয়ে রবো ভুলে কাজে।

...পুরোটা

ঈদের খুশি
আল মাশরেক :

ঈদের খুশি মোকাম্মাল হবেনা সমাজে ততদিন।
অহীর বিধান ধরনীতে হবেনা কায়েম যতদিন।

আজো পথে-ঘাটে বসে মাজ্লুম মানবরা কাঁদে।
শান্তির অচিন পাখিটা পড়ে গেছে শক্ত ফাঁদে।

মানবের রক্তে হুলি খেলা হয়নি আজো বন্ধ।
বাতাসে ভেসে বেড়ায় দেশে লাশের পঁচা গন্ধ।

ফুলের মত জীবন যাদের কুসুমের মত প্রাণ।
হায়েনার দল ছিড়ে খাচ্ছে ওদের জীবন্ত জান।

নারীর চিৎকারে কাঁদে পানির মাছ গাছের পাখি।
এত দুঃখ-বেদনার পাহাড় কোথায় লুকিয়ে রাখি?

আবাল-বৃদ্ধ বণিতা নিরাপত্তার অভাবে ভোগে।
জাহেলিয়াতকে হার মানিয়ে ধরেছে নতুন রোগে।

কবে ফিরে আসবে মানবের মাঝে মানবীয় গুণ?
কবে বন্ধ হবে ধর্ষণ আর নিস্পাপ শিশু খুন?

কোনদিন ছোটরা পাবে অসীম স্নেহ মমতা আদর?
আর বয়জেষ্ঠরা পাবে মূল্যায়ন ভক্তি শ্রদ্ধা কদর।

যেদিন অহীর ছোঁয়ায় পূর্ণতা পাবে ঈদের খুশি।
সেদিন অসহায় মানুষের মুখে ফুটবে চাঁদের হাসি।

...পুরোটা

আবর্ত
মোঃসরোয়ার জাহান :

চতুর নক্ষত্র কেড়ে নেয় 
স্বাধীনতাগুলো 
রেখে যায় বিনিদ্র চোখ 
চাষহীন পড়ে থাকে অনাবাদি জমি 
লালন কন্ঠে বাঁধে সোনালি শিকল!

বেদনাময় বিশ্বাসহীনতায়
স্বপ্নহীন সংস্কারের 
বাধা পেরিয়ে
বিনাশের রক্তপাত শেষে
দ্যাখা হলো তোমার আমার!

নিষিদ্ধ বাতাসে ভেসে আসে কান্না
তীব্র আবর্তে চিহ্ন মুছে যায় তার 
জীবনের সুখটান লেগে থাকে ঠোঁটে !

...পুরোটা

আমি
মিনারুল আলম :


সুদৃশ্য শৃঙ্খল শৃঙ্গ দেখবো বলে,,
পাহাড় বলল আমি ক্ষয়িষ্ণু।
আমি সাগরের কাছে গেলাম,,
আকণ্ঠ তৃষ্ণা মেটাবো বলে।
সাগর বলল নদীর কাছে যেতে,,
আমি নদীর কাছে গেলাম,,
নদী বলল এ'জল তোমার নয়,,
আমি যে সাগরে প্রবাহ মান।
আমি বরফের মেরুতে গেলাম,,
গভীর শীতলতা অন্বেষণে,,
বরফ বলল আমিতো গলে পরছি,, 
তোমাদের অমানবিক উষ্ণতায়।
অতঃপর আমি মরুর কাছে গেলাম উষ্ণ হতে।
কিন্তু সে বলল ভুল সময়ে কেন এলে পথিক,,
এখন রাত আর আমি শীতলতম বালিয়াড়ি।
অবশেষে আমি তেমার কাছে গেলাম,, 
ভুলগুলোকে শুদ্ধ করবো বলে।
আর তখনি তুমি অস্তগামী সূর্যের মত,, 
নেমে গেলে সাগর জলে।
...পুরোটা

উৎসবের ভ্রাতৃত্ব
রূপক চৌধুরী :

সবার খুশিতে সকলে আমরা যদি না হাসতে পারি,

 বিভাজন ভুলে উদারতা সনে মনের মিতালী গড়ি।

 নির্জনে তুমি কত কাল রবে সমাজকে ফেলে দূরে,

 সকলে আমরা একই মানুষ এক পৃথিবীর নীড়ে ।

 তোমার ঈদের খুশির লহর আমার নৌকোয় বাজে,

 আমার পূজার আরতির সুর তোমার হৃদয়ে নাচে ।

 সকলের দুঃখে ব্যথাতুর হয়ে সমব্যথী হতে পারি,

 চলতে চলতে থামবে সবার মানব জীবন গাড়ি ।

...পুরোটা

সকালের আলো

Sokaler Alo

সম্পাদক ও প্রকাশক : এস এম আজাদ হোসেন

নির্বাহী সম্পাদক : সৈয়দা আফসানা আশা

সকালের আলো মিডিয়া ও কমিউনিকেশন্স কর্তৃক

৮/৪-এ, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত

মোবাইলঃ ০১৫৫২৫৪১২৮৮ । ০১৭১৬৪৯৩০৮৯ ইমেইলঃ newssokaleralo@gmail.com

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত

Developed by IT-SokalerAlo     hit counters Flag Counter